মহান আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য। পার্থিব জীবনে আল্লাহর দাসত্ব করাই মানবজীবনের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। এটাই দুনিয়া-আখেরাতে মুক্তি ও শান্তি লাভের অনন্য উপায়। বান্দা যখন আল্লাহর নৈকট্য লাভে সমর্থ হয়, তখন তার নাজাতের পথ সুগম হয়। আর আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের বড় মাধ্যম হ’ল- গোপন ইবাদত। যার আমলনামায় গোপন ইবাদতের পরিমাণ বেশী থাকে, আল্লাহর রেযামন্দি ও জান্নাত লাভে সে তত বেশী অগ্রগামী হয়। সেজন্য আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এমন কিছু গোপন আমল থাকা উচিত, যে আমলের ব্যাপারে পৃথিবীর কোন মানুষ জানতে পারবে না; জানবেন কেবল আল্লাহ রাববুল আলামীন।
ইবাদত শব্দের অর্থ হ’ল- দাসত্ব, উপাসনা, বন্দেগী, গোলামী। আল্লাহর ইবাদত করার অর্থ হ’ল- আল্লাহর দাসত্ব করা, তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা, চূড়ান্ত বিনয়ের সাথে তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা, সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিনম্র হয়ে তাঁর সামনে নিজেকে তুচ্ছ করে উপস্থাপন করা, আল্লাহর নির্দেশিত ও রাসূল (ছাঃ) প্রদর্শিত পদ্ধতি অনুযায়ী তাঁর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য তালাশ করা ইত্যাদি। ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) বলেন, ‘ইবাদত একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। আল্লাহ পসন্দ করেন ও সন্তুষ্ট হন- এমন সব প্রকাশ্য ও গোপনীয় কথা ও কাজ ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত’। এই সংজ্ঞার মাধ্যমে বোঝা যায় যে, ইবাদত দুই রকম হ’তে পারে: প্রকাশ্য ও গোপনীয়।
যে ইবাদত সম্পাদনকালে মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়, সেটা প্রকাশ্য ইবাদত। আর যেটা নির্জনে সবার অগোচরে আদায় করা হয়, সেটা গোপন ইবাদত। গোপন ইবাদতের সংজ্ঞা দিয়ে ড. বদর আব্দুল হামীদ হামীসাহ বলেন, ‘গোপন ইবাদত হচ্ছে সেই ইবাদত, যা একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহর জন্য সম্পাদন করা হয় এবং শ্রæতি ও লৌকিকতা থেকে দূরে থেকে অন্যসব বান্দার অন্তরালে গিয়ে আদায় করা হয়’।
ড. আব্দুর রহমান আল-‘আক্বল বলেন, ‘নেক আমল সমূহের মাঝে গোপন ইবাদত কেবল বান্দা ও তাঁর রবের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে। আর এধরনের ইবাদতের মর্যাদা সুমহান। কারণ এতে আল্লাহর প্রতি বান্দার একনিষ্ঠতা ও সততা ফুটে উঠে। বান্দা রিয়া, শ্রæতি ও খ্যাতি লাভের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে দূরে থাকতে পারে’।
জুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাঃ) বলেন, ‘কেউ যদি কোন গোপন নেক আমল করতে সক্ষম হয়, তবে সে যেন তা করে’। ইবনে দাঊদ আল-খুরাইবী (রহঃ) বলেন,‘সালাফগণ প্রত্যেকে চাইতেন যে, তার যেন এমন কোন গোপন নেক আমল থাকে, যে সম্পর্কে না জানবে তার স্ত্রী, না অন্য কেউ’।
আক্বীল ইবনে মা‘ক্বিল বলেন, আমি আমার চাচা ওয়াহ্হাব ইবনে মুনাবিবহ (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘হে বৎস! গোপনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত কর। তাহ’লে আল্লাহ প্রকাশ্যে তোমার কর্মকে সত্যে পরিণত করবেন। কারণ যে গোপনে নেক আমল করে এবং সেই নেক আমল তার এবং আল্লাহর মাঝে থাকে, তাহ’লে সে পন্থা গ্রহণ করতে পেরেছে এবং গন্তব্যে পৌঁছতে পেরেছে। আর যে ব্যক্তি তার নেক আমল গোপন করে, যে আমলের ব্যাপারে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, তবে তার আমল সম্পর্কে তিনিই জেনেছেন- যিনি জানলে যথেষ্ট, যাঁর কাছে তার আমল সংরক্ষিত থাকবে এবং যিনি তার প্রতিদান বিনষ্ট করবেন না। আল্লাহর জন্য কৃত গোপন নেক আমল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না’। শুমাইত্ব ইবনে আজলান (রহঃ) বলেন, ‘মহান আল্লাহ দুনিয়ার সাথে নির্জনতাকে যুক্ত করে দিয়েছেন, যাতে অনুগত বান্দারা নির্জনতায় তাঁর সান্নিধ্য গ্রহণ করতে পারে’।
আমরা কোন ইবাদত গোপনে করব?
গোপন ইবাদতে আত্মনিয়োগ করার আগে এটা জানা যরূরী যে, কোন ইবাদত গোপনে করা শরী‘আত সম্মত এবং কোন ইবাদত প্রকাশ্যে করাই শরী‘আতের বিধান। এ ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে যে কেউ গোপন ইবাদতের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করতে পারে। গোপন ইবাদতের মূলনীতি হ’ল- ঐচ্ছিক, নফল, সুন্নাত, মুস্তাহাব প্রভৃতি আমলগুলো গোপনে করা। তবে ফরয ও ওয়াজিব আমল প্রকাশ্যে করতে হবে। অনুরূপভাবে যে ইবাদতগুলো ইসলামের শি‘আর বা নিদর্শন হিসাবে চিহ্নিত সেগুলো প্রকাশ্যে আদায় করাই শরী‘আতের নির্দেশ।
ইবনুল আরাবী (রহঃ) বলেন, ‘আমল সম্পাদনের মূলনীতি হ’ল ফরয আমল সমূহ প্রকাশ্যে সম্পাদিত হবে। আর নফল আমল গোপনীয় হবে’। যেমন- পাঁচ ওয়াক্ত ফরয ছালাত জামা‘আতে প্রকাশ্যে আদায় করতে হবে এবং নফল ছালাতসমূহ গোপনে আদায় করা উত্তম হবে। অনুরূপভাবে যাকাত প্রকাশ্যে আদায় করা হবে এবং নফল দান-ছাদাক্বাহ গোপনে আদায় করা উত্তম হবে। কারণ কেউ যদি মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় না করে এবং বায়তুল মালে যাকাত প্রদান না করে; তবে তাকে ছালাত পরিত্যাগকারী ও যাকাত অনাদায়কারী মনে করা হ’তে পারে এবং তাকে ফাসেক বা পাপিষ্ঠ ভাবার সম্ভাবনা থাকবে। তবে নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে আমল গোপন করাই উত্তম এবং এর ফযীলতও অনেক বেশী। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘কোন ব্যক্তি যদি এমনভাবে নফল ছালাত আদায় করে যে, সেটা মানুষ দেখতে পায়নি, তবে তার সেই ছালাত মানুষের সামনে পাঁচিশবার আদায় করার মতো মর্যাদাপূর্ণ’।
অন্যত্র তিনি (ছাঃ) বলেছেন,হে লোক সকল! তোমরা নিজেদের বাড়ীতে (নফল) ছালাত আদায় কর। কেননা মানুষের জন্য সবচেয়ে উত্তম ছালাত হ’ল যা সে তার ঘরে আদায় করে, তবে ফরয ছালাত ব্যতীত’। অত্র হাদীছের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সেসব নফল ও সুন্নাত ছালাত বাড়িতে আদায় করতে বলেছেন, যেগুলো আদায়ের জন্য জামা‘আতে যোগদান করা বা মসজিদে যাওয়া শর্ত নয়। যেমন তাহাজ্জুদের ছালাত, চাশতের ছালাত ইত্যাদি। কিন্তু যে ছালাতগুলো ইসলামের শি‘আর বা নিদর্শন, সেগুলো প্রাকশ্যে আদায় করাই বিধেয়। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত ফরয ছালাত, ঈদায়েনের ছালাত, ছালাতুল কুসূফ ও ইস্তিসক্বার ছালাত প্রভৃতি।
কুরআনের একটি আয়াত প্রাসঙ্গিক। যেমন- আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান কর, তবে তা কতই না উত্তম! আর যদি তা গোপনে কর ও অভাবীদের প্রদান কর, তবে তোমাদের জন্য সেটা আরো উত্তম। (এর দ্বারা) তিনি তোমাদের কিছু পাপ মোচন করে দিবেন। আর তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন’ (বাক্বারাহ ২/২৭১)।
ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন, ‘অত্র আয়াত নাযিল হয়েছে নফল ছাদাক্বাহর ব্যাপারে। কেননা নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে আমল প্রকাশ করার চেয়ে গোপন করার ফযীলত বেশী। এটা শুধু দান-ছাদাক্বার ক্ষেত্রে নয়; বরং অন্যান্য নফল ইবাদতের ক্ষেত্রেও এই বিধান প্রযোজ্য। কারণ গোপনে যে ইবাদত করা হয় সেটা রিয়া মুক্ত ও খুলূছিয়াতপূর্ণ হয়ে থাকে। তবে ফরয ইবাদতের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য নয়; বরং সেটা প্রকাশ্যে আদায় করাই উত্তম’। হাফেয ইবনে কাছীর (রহঃ) বলেন, ‘তবে প্রকাশ্যে আমল করার মধ্যে যদি অধিক কল্যাণ ও উপকারের সম্ভাবনা থাকে এবং মানুষের উপকৃত হওয়ার ব্যাপরটি নিশ্চিত থাকে, তাহ’লে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমল প্রকাশ্যে করাই উত্তম হবে’। যেমন কেউ যদি গোপনে আল্লাহর পথে দান করে, তবে সেটা উৎকৃষ্ট ইবাদত। কিন্তু অবস্থা যদি এমন হয় যে, সে প্রকাশ্যে দান করলে তার দেখাদেখি আরো মানুষ দানে উৎসাহিত হ’তে পারে, তবে সেই ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে দান করাই উত্তম। অর্থাৎ কখনো নফল ইবাদত প্রকাশ্যে করাও উত্তম হ’তে পারে।
যেমন ইবনু কুদামা (রহঃ) বলেন, ‘আমল গোপন করার মাধ্যমে ইখলাছ ও রিয়া থেকে মুক্তি লাভের উপকার পাওয়া যায়। অপরদিকে প্রকাশ্য আমলেরও ফায়েদা হ’ল- তা অনুসরণ করা হয় এবং মানুষ সৎকাজে উৎসাহিত হয়। কিন্তু এমন কিছু আমল আছে, যেগুলো গোপন করা সম্ভব নয়। যেমন- হজ্জ ও জিহাদ। তবে প্রকাশ্যে আমলকারীকে নিজের মনের নিয়ন্ত্রণে সতর্ক থাকতে হবে। যাতে লৌকিকতা বা প্রদর্শনেচ্ছা মনে জাগ্রত না হয়। বরং উক্ত প্রকাশ্য আমলের মাধ্যমে তিনি (শরী‘আতের নির্দেশ) অনুসরণের নিয়ত করবেন। সেজন্য দুর্বলমনা লোকদের প্রকাশ্য আমলের মাধ্যমে নিজেকে ধোঁকায় ফেলা মোটেও উচিত নয়’। অর্থাৎ যারা দুর্বল ঈমানের অধিকারী তাদের জন্য নফল ইবাদত গোপনে করাই উত্তম।
ওলামায়ে কেরাম বিষয়টিকে স্পষ্ট করে বুঝানোর জন্য বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন- আমল প্রকাশ্য ও গোপন করার বেশ কিছু অবস্থা আছে, এই অবস্থা অনুযায়ী ইবাদতকারীকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অবস্থাগুলো সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত হ’ল।
১ম অবস্থা : সুন্নাত ও নফল আমল গোপনে করা সম্ভব হ’লে গোপনে করবে এবং এটাই উত্তম। যেমন- তাহাজ্জুদ ছালাত, চাশতের ছালাত, দান করা, কুরআন তেলাওয়াত করা, যিক্র করা, আল্লাহর কাছে দো‘আ করা, তওবা-ইস্তিগফার, কারো ঋণ পরিশোধ করা, নফল ছিয়াম পালন করা, অন্তরে আল্লাহভীতি বজায় রাখা, মন থেকে হিংসা-অহংকার দূর করা ইত্যাদি।
২য় অবস্থা : শারঈ বিধান অনুযায়ী যে আমল প্রকাশ্যে করার কথা, তবে সেটা প্রকাশ্যেই করতে হবে। যেমন- জুম‘আর ছালাত, মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের জন্য জামা‘আতে হাযির থাকা, জিহাদে অংশগ্রহণ করা, হজ্জ করা, তাওয়াফ করা, সাফা-মারওয়া সাঈ করা, জামরাতে পাথর নিক্ষেপ করা, ঈদের ছালাতে হাযির হওয়া, ঈদায়েনের তাকবীর পাঠ করা, চাঁদ দেখে রামাযানের ছিয়াম রাখা ও ছাড়া, কুরবানী করা, ইলমি মসলিসে উপস্থিত হওয়া, দাওয়াতী কাজ করা, সত্য কথা জোরে-শোরে বলা, ছালাতের জন্য আযান ও ইক্বামত দেওয়া, শিক্ষা দেওয়ার জন্য তেলাওয়াত করা, মানুষের মাঝে দ্বীনী জ্ঞান বিতরণ করা প্রভৃতি। ইবরাহীম ইবনে আদহাম (রহঃ) বলেন, ، ‘হিংস্র পশু থেকে যেভাবে পালাও, একইভাবে মানুষের কাছ থেকে পালিয়ে যাও। তবে জুম‘আ ও জামা‘আতে ছালাত আদায় করা থেকে পিছনে থেকো না’।
৩য় অবস্থা : আমলটি প্রকাশ্যে করা যায়, আবার গোপনেও করা যায়। সেক্ষেত্রে প্রকাশ্যে করতে যার অন্তরে রিয়া বা লোক দেখানোর ভাব জাগ্রত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে, তার জন্য আমলটি গোপনে করা সুন্নাত হবে। আর যে মনে করবে আমলটি প্রকাশ করলে অন্য লোকেরা তার অনুকরণ করে শিখবে, তাকে দেখে সেই আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ হবে বা আমলের পদ্ধতি জানবে, তবে তার জন্য সেই আমলটি প্রকাশ্যে করা সুন্নাত হবে। যেমন কোন আলেম জনসম্মুখে নফল ছালাত আদায় করল বা তেলাওয়াতের সেজদা দিল- এতে উপস্থিত আম জনতা নফল ছালাতের পদ্ধতি, রাক‘আত সংখ্যা, বিধান সম্পর্কে জানতে পারল। অনুরূপভাবে কেউ একজন কোন মহতী কাজে দান করল, ফলে তার দেখাদেখি আরো অনেক মানুষ দান করল। এরকম আরো অনেক আমল আছে, যা অবস্থা ও নিয়ত ভেদে প্রকাশ্যে করা যায়। তবে যাদের ঈমান দুর্বল তাদের এই সুযোগ গ্রহণ না করাই উত্তম।
আল্লাহর রেযামন্দি হাছিলে গোপন ইবাদত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। কেননা যারা প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা, কেবল তারাই গোপন নেকআমলে আত্মনিয়োগ করতে পারে। নিজেকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসাবে গড়ে তোলার জন্য গোপন ইবাদতে অভ্যস্ত হওয়া অবশ্যক। আর এই আবশ্যকীয় কাজটি তখনই করা সহজ হয়, যখন এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীতা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান অর্জিত হয়।
বান্দা যখন দৃঢ়ভাবে বিশ্নাস করবে- তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সবধরণের কর্মকান্ড ও নড়াচড়া আল্লাহ পর্যবেক্ষণ করছেন, তখন তার বাহ্যিক ইবাদতের ন্যায় গোপন আমলগুলোও সুনিপুণ হবে। কারণ এমনটা কখনো হয় না যে, কোন বান্দা গোপন ইবাদতে খুবই সক্রিয় থাকে; কিন্তু প্রকাশ্য ইবাদত-বন্দেগীতে গাফেলতি ও অলসতা করে। সাধারণত কারো ক্ষেত্রে এরকম হওয়া অসম্ভব। আর মুনাফিক্বরা যেখানে প্রকাশ্য ও ফরয ইবাদতেই অলসতা করে, সেখানে তাদের জন্য গোপন ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা তো আকাশ কুসুম কল্পনা। সেজন্য একনিষ্ঠ ঈমানের একটি বড় আলামত হ’ল গোপন ইবাদত করতে পারা। বান্দার গোপন নেক আমল যখন বেড়ে যায়, তখন তিনি ঈমানের সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হ’তে পারেন। আর ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে- ইহ্সান। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,ইহসান হচ্ছে তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ; যদি তাকে দেখতে না পাও তবে বিশ্বাস রাখবে- তিনি তোমাকে দেখছেন’। এই অনুভূতি নিয়ে আল্লাহর আনুগত্য করা যেমন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ইবাদত, ঠিক তেমনি গোপনে তাঁর অবাধ্যতা ও পাপাচার থেকে বিরত থাকাও অনেক উঁচু দরের ইবাদত।
এজন্য ছাহবায়ে কেরাম গোপনে আল্লাহর ইবাদতে যত সক্রিয় ছিলেন, তেমনি গোপনে পাপে লিপ্ত হওয়া থেকে যোজন যোজন দূরে থাকতেন। তারা গোপন ইবাদতকে ঈমান ও নেফাক্বীর মধ্যে পার্থক্যকারী মনে করতেন। অর্থাৎ তারা বিশ্বাস করতেন যার মধ্যে গোপন আমল আছে তিনি প্রকৃত ঈমানদার এবং তিনি মুনাফিক্বী থেকে মুক্ত। যেমন একবার এক লোক এসে হুযায়ফা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি নিজের জন্য মুনাফিক্ব হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছি’। তখন হুযায়ফা (রাঃ) বললেন,তুমি কী নির্জনে গেলে (নফল) ছালাত আদায় কর? পাপ করে ফেললে ক্ষমা প্রার্থনা কর? লোকটা হ্যাঁ সূচক উত্তর দিল। তখন তিনি বললেন, ‘যাও! আল্লাহ তোমাকে মুনাফিক্ব বানাবেন না’। আব্দুল আযীয আত্ব-ত্বারীফী বলেন, ‘মানুষের যদি গোপন ইবাদতের কোন অংশ না থাকে, তবে তার ইবাদতের প্রকাশ্য দিকটা ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। তাই তো অনেককে দেখা যায়, তারা প্রকাশ্যে আল্লাহর জন্য ইবাদত করে; কিন্তু তাদের গোপন ইবাদত ত্রæটিপূর্ণ ও ক্ষণস্থায়ী হয়’। সুতরাং গোপন আমল বান্দার খাঁটি ঈমানের পরিচয় বহন করে এবং নিফাক্বীর কদর্যতা থেকে পবিত্র হওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করেন!
হৃদয় যমীনে ঈমান ও তাক্বওয়ার শিকড় যত শক্তিশালী হয়, নেক আমলের বৃক্ষ ততবেশী ফলবতী হয়। কারণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ইবাদতগুলোর ভিত্তি হ’ল হৃদয়ে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে গোপন ইবাদত যার যত সুন্দর হয়, তার বাহ্যিক আমলগুলো ততই পরিপাটি হয়। এজন্য মহান আল্লাহ গোপন ইবাদত অত্যধিক পসন্দ করেন। তিনি বান্দাকে সঙ্গোপনে দো‘আ-প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ডাক বিনীতভাবে ও চুপে চুপে। নিশ্চয়ই তিনি সীমালংঘন কারীদের ভালবাসেন না’ (আ‘রাফ ৭/৫৫)।