সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলা পর্যায়ে সাফল্য অর্জনকারী শ্রেষ্ঠ ৩ জন অদম্য নারীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও মহিলা বিষয়ক কার্যালয় গোলাপগঞ্জ উপজেলার উদ্যোগে ‘অদম্য নারী’-২০২৪ শীর্ষক কার্যক্রমের আওতায় উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচিত ‘শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী সম্মাননা প্রদান’ অনুষ্ঠান গত ৯ ডিসেম্বর সোমবার সকালে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।অনুষ্ঠানের সভাপতি গোলাপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিলটন চন্দ্র পাল ও সঞ্চালক গোলাপগঞ্জ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা (অঃ দাঃ) খাদিজা খাতুন উপজেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ ৩ জন অদম্য নারী অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী কায়স্থগ্রামের পারভীন আক্তার, শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী আমকোনা গ্রামের রিফাত আরা রিফা, সফল জননী খর্দ্দাপাড়া (তেতলীবাড়ি) গ্রামের আফিয়া বেগম-কে সম্মাননা ও পুরস্কার প্রদান করেন।উপজেলা পর্যায়ে অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী পারভীন আক্তার। তিনি ফুলবাড়ী ইউনিয়নের কায়স্থাগ্রাম নিবাসী মোঃ আছবর আলীর মেয়ে। বাবা ছিলেন একজন প্রান্তিক কৃষক, পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। ১ ভাই ৫ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। মা বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়ে লেখাপড়া করে সরকারি চাকুরীজীবি হবে। কিন্তু এস.এস.সি পাশ করার পর সংসারের অভাবের তাড়নায় তার পড়াশুনা করা সম্ভব হয়নি। ৮ সদস্যের পরিবারে ডালভাত খাওয়া ছিল কষ্টকর। তাই পারভীন আক্তার দারিদ্রের কষাঘাত থেকে বাঁচার জন্য বাড়িতে বসে নঁকশি ও সেলাই কাজ শুরু করেন। কিন্তু সেলাইয়ের উপর কোন প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন না থাকায় তিনি খুব বেশি কাজ পেতেন না, এতে তার সংসারের অভাবও মিটতো না।পারভীন আক্তার গোলাপগঞ্জ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয় পরিচালিত ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে সফলভাবে প্রশিক্ষণ শেষ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে ৯ হাজার টাকা প্রশিক্ষণ ভাতা ও নিজের হাত খরচের টাকা দিয়ে ১টি সেলাই ও ১টি লক মেশিন ক্রয় করেন। এরপর বাড়ীর আশেপাশের মহিলাদের পোষাকের কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, গোলাপগঞ্জ, সিলেট হতে সেলাই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ঋণ বাবদ ৫০ পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ীর পাশে ১টি দোকান ভাড়াসহ ৩ জন মেয়েকে নিয়ে পারভীন বুটিকস্ এন্ড হ্যান্ডিক্রাফ্ট দিয়ে নিজের আত্মকর্মের পথ চলা শুরু করেন। তিনি পযার্য়ক্রমে গবাদিপশু লালন পালন, মৎস্যচাষ, আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষি প্রকল্প, মাশরুম চাষ, রান্না বিষয়কসহ অনেক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।পারভীন আক্তার ২০১৮ সালে উপজেলা চত্বরে আয়োজিত উন্নয়ন মেলায় ১টি স্টল বরাদ্দ নেন। সব পণ্য বিক্রয় ছাড়াও প্রায় ১লক্ষ টাকার অর্ডার পান তিনি। পন্য উৎপাদনের জন্য কর্মী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে থাকেন। বর্তমানে পারভীন বুটিকস্ এন্ড হ্যান্ডিক্রাফ্ট নামে তার ব্যবসা চলমান; যা একটি ব্রান্ড নামে সর্বমহলে পরিচিত। তিনি পারভীন ইয়ুথ ট্রেনিং সেন্টার নামে ১টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলেন। এছাড়াও বহুমুখী এগ্রো ফার্ম নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন প্রকল্পে ২২ জনের কর্ম সংস্থান হয়েছে।পারভীন আক্তারের বর্তমান মূলধন ২৪ লক্ষ ৯৮ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নীট আয় ৮ লক্ষ ২১ হাজার টাকা। তাঁর সকল কর্মসংস্থানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় স্থানীয়ভাবে ৬০/ ৬৫ জনের আত্মকর্মসংস্থান হয়েছে। আত্মকর্মী গড়ে তোলার প্রয়াসে গোলাপগঞ্জ উপজেলায় গ্রামে গ্রামে গিয়ে ৭ হাজার ৫ শত নারীকে বিনামূল্যে পোষাক তৈরী, ব্লক-বাটিক, বুটিকস, ফার্মিং, জৈবসার উৎপাদন, কেঁচো কম্পোজ সার, গবাদিপশু লালন পালন, মৎস্যচাষ, আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষি প্রকল্প, মাশরুম চাষ, রান্না বিষয়কসহ প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। পারভীন আক্তার সম্পূণ নিজের চেষ্টায় আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে সমাজের হতাশাগ্রস্থ নারীদের জন্য উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।দরিদ্র পরিবার থেকে নিজের চেষ্টায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরিতে পারভীন আক্তার উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী।শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী অদম্য নারী রিফাত আরা রিফা। তিনি আমকোনা গ্রামের মোহাম্মদ আলাউদ্দিন এর মেয়ে। তাঁর পিতা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন সাবেক যুগ্ম সচিব ছিলেন এবং মাতা একজন গৃহিনী । তাঁর স্বামী নূর উদ্দিন আহমদ বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের একজন অধ্যাপক। তিনি দুই সন্তানের জননী। ২০১৬-২০১৭ সালে আমেরিকর একটি প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ফিরে এসে দেশের মানুষের জন্য সেচ্ছাসেবী হয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি এমবিএ পাস হওয়ার সুবাদে সিলেটের একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে এইচ.আর হিসেবে যোগদান করেন। তিনি সিলেটের মুহিবুর রহমান স্কুলে সহকারি শিক্ষক হিসেবে চাকুরী করেছেন। ২০২০ সালে করোনার সময় সমাজের নানা সমস্যা নিয়ে লাইভ প্রোগামের মাধ্যমে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করেন।রিফাত আর রিফা ৪এম টিভি ইউএসএ-তে কাজ করে অনেক মানুষের কর্মস্থান তৈরী করেছেন। সেই সময় তাঁর করা প্রবাসীর মন অনুষ্ঠানটি সকলের কাছে প্রশংসা লাভ করে। বড় বোন আফসানা আলাউদ্দিন প্রতিবন্ধী থাকায় অটিজম বিষয় নানা কোর্স করেন এবং সেখানেই পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করছেন। আমেরিকার ডাঃ জেননিফার ডাসটয়-এর ফাউন্ডেশনেও কাজ করছেন। সকলের সহযোগিতায় তিনি সফল হতে পেরেছেন। অটিজম বিষয়ে এখনো পড়ালেখা করছেন।২০২০ সালে আমেরিকা যে স্কুলে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন, বার্তমানে তিনি সেখানের একজন সম্মানিত বোর্ড অফ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছেন। রিফাত আর রিফা একমাত্র প্রথম বাঙালি বোর্ড মেম্বার। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ বেতার, সিলেট কেন্দ্রের একজন নিয়মিত অনুষ্ঠান ঘোষিকা ও এফএম ৯০ মোগাহর্জ (রেডিও জেককী) কর্মরত আছেন। তিনি ২০২১ সাল থেকে রিফাতস্ সোস্যাল স্টুডিও নামক ফেইসবুক পেইজের মধ্যে অটিজম বিষয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান সহ সমাজের নানা সুবিধা ও অসুবিধা নিয়ে বিশেষজ্ঞ আলোচক এনে সবাইকে জানার সুযোগ করেছেন।রিফাত আর রিফা নিজের আয় ও পরিবারের আত্মীয়দের আর্থিক সহযোগিতায় গরীব মেয়ের বিয়ে, শীত বস্ত্র, হুইল চেয়ার, রিক্সা-ভ্যান, এতিমখানায় খাবার প্রদান, প্রতিবন্ধী সংস্থায় আর্থিক সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছেন। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে অনেকেই আত্মহত্যা করার মত মন মানসিকতা থেকে ফিরে এনেছেন।উপরোক্ত কাজের মাধ্যমে শিক্ষা ও চাকুরীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন অবদান রাখায় শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী ক্যাটাগরিতে রিফাত আর রিফা শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী পুরস্কার লাভ করেন।সফল জননীর কৃতিত্ব অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরীতে শ্রেষ্ঠ অদন্য নারী আফিয়া বেগম। ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের খর্দ্দাপাড়া (তেতলীবাড়ি) গ্রামের হেলাল উদ্দিন আহমদের স্ত্রী আফিয়া বেগম। বর্তমানে সিলেট নগরীর লামাপাড়া ৫০৬/ক, মোহিনী নিবাসী। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে তার বিবাহ হয়। ৩ সন্তানের জননী আফিয়া বেগম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালেয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। স্বামীও সরকারী কর্মচারী ছিলেন। স্বামী ও তার স্বল্প টাকার বেতনে সংসারে বয়স্ক শ্বশুড়-শাশুড়ীর চিকিৎসা, সন্তানদের লেখাপড়া ও সংসার খরচ চালানো খুব কষ্টকর ছিল। এরপরও তিনি পরিবারের সকল দায়িত্ব পালন করে নিজ সন্তানদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেন। রাত জেগে জেগে সন্তানদের পাশে থেকে তাদের পড়ালেখায় সহায়তা করতেন। তার এই কষ্টের ফল স্বরুপ ধীরে ধীরে সন্তানরা স্কুলে ভালো রেজাল্ট করেছে।আফিয়া বেগমের ৩ সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে হোমায়রা আহমদ নূহা প্রাথমিক, জুনিয়র, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সরকারি বৃত্তি ও বিভিন্ন পাবলিক মেধাবৃত্তি লাভ করেছে। বর্তমানে সিলেট এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজে এম.বি.বি.এস ফাইনাল পরীক্ষার্থী। মেজো মেয়ে জোহরা আহমেদ দ্বোহা অনুরূপ বৃত্তি লাভ করেছে। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ জাতীয় মেধাবী কোটায় ৫০তম স্থান অর্জন করে এম.বি.বি.এস ২য় বর্ষে অধ্যায়নরত আছে। ৩য় ছেলে মুজাহিদ আহমেদ দাইয়ান প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় সরকারী ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়েছে, এছাড়াও সে বিভিন্ন পাবলিক প্রতিযোগিতা অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন স্থান অর্জন করে। বর্তমানে সিলেট সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের এস.এস.সি পরীক্ষার্থী (২০২৫ ব্যাচ) অধ্যায়ণরত আছে। আফিয়া বেগমের প্রত্যেক সন্তানই কৃতি শিক্ষার্থী হিসেবে বহু সনদ প্রাপ্ত হয়ে পড়ালেখার বাইরেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে। বহুকষ্টে পরিস্থিতির সাথে লড়াই করে তিনি আত্মবিশ্বাস ও নিজ প্রচেষ্টায় নিজের সন্তানদের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং জীবনমান উন্নত করার কাজে এগিয়ে এসেছেন।জীবন সংগ্রাম শেষে তিনি একজন সফল মা হতে পেরেছেন। জীবনের সব শখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের শিক্ষিত করায় আফিয়া বেগম সফল জননী ক্যাগরিতে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী সম্মাননা লাভ করেছেন।গোলাপগঞ্জ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা (অঃ দাঃ) খাদিজা খাতুন বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়াধীন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে তৃণমূলের সংগ্রামী নারীদের উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে প্রতিবছর জীবনযুদ্ধে জয়ী নারীদের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ‘অদম্য নারী অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কার্যক্রমের ধরাবাহিকতায় বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে গোলাপগঞ্জ উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ৩ জনকে অদম্য নারীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। আগামীতেও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী সম্মাননা প্রদান অব্যাহত থাকবে।